মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১৪ নভেম্বর ২০১৬

জামদানি

প্রাচীনকালে তাঁত বুনন প্রক্রিয়া কার্পাশ তুলার সুতা দিয়ে মসলিন নামে সুক্ষ বস্ত্র তৈরি হতো এবং মসলিনের উপর যে জ্যামিতিক নকশাদার বা বুটিদার বস্ত্র বোনা হতো তারই নাম জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়ি বুঝানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশা সমৃদ্ধ ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, ঘাগরা, রুমাল, পর্দা, টেবিলক্লথ সবই জামদানির আওতায় পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি নকশার কুর্তা ও শেরওয়ানীর ব্যবহার ছিল। মুঘল আমলের শেষের দিকে নেপালে ব্যবহৃত পোশাক রাঙ্গার জন্য বিশেষ ধরণের জামদানি কাপড় তৈরি হতো। জামদানির নামকরণ বিষয়ে সঠিক কিছুই জানা নেই। তোফায়েল আহম্মেদ (১৯৬৪) এর মতে ফারসি শব্দ জামা মানে কাপড়, দানা অর্থ বুটি; অর্থ্যাৎ জামদানির অর্থ বুটিধার কাপড়। সম্ভবত মুসলমানরাই জামদানির প্রচলন করেন এবং দীর্ঘদিন তাদের হাতেই এ শিল্প একচেটিয়াভাবে সীমাবদ্ধ থাকে। ফারসি থেকেই জামদানি নামের উৎপত্তি বলে অনুমান করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী, শ্লোক, বিবরণ থেকে মনে হয় যে, খৃষ্টপূর্ব প্রথম দশক থেকে বাংলায় সূক্ষ মিহি বস্ত্র সমাদৃত হয়ে আসছিল। বাংলার কার্পাস বা কাঁপাশ বস্ত্রের বিকাশ ঘটেছে অনেক বিবর্তনের মাধ্যমে। দুকূল নামের বস্ত্রের ক্রমবিবর্তন-ই মসলিন। জামদানির নকশা প্রচলন ও মসলিনের  বিকাশ পাশাপাশি হয়েছিল মনে হয়। উল্লেখ্য, ইরাকের বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র মসুলে যে সূক্ষ বস্ত্র তৈরি হতো সেটিকে মসুলি বা মসুলিন বলা হতো। নবম শতাব্দীতে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মানের স্রিলসিলাত-উত-তওয়ারিখে উল্লেখিত রুমি নামক রাজ্যে সূক্ষ ও মিহি সুতি বস্ত্রের বিবরণ পাওয়া যায়। রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ে প্রস্তুতকৃত মসলিনের প্রশংসা করেছেন। জামদানি শিল্পকর্ম পরিপূর্ণতা লাভ করে মুঘল আমলে। ঢাকা জেলার প্রত্যেক গ্রামেই কমবেশি তাঁতের কাজ হতো । উৎকৃষ্ট ধরণের জামদানি ও মসলিন তৈরির জন্য ঢাকা, সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ি, জঙ্গলবাড়ি, বাজিতপুর প্রসিদ্ধ ছিল। ইউরোপীয়রা ছাড়া ইরানি, আর্মেনিয়ান, মুঘল, পাঠান বণিকরা এ সব ঢাকাই মসলিন ও জামদানি ব্যবসায়ে উৎসাহী ছিলেন। মুঘল সম্রাট, বাংলার নবাব ও অন্যান্যদের ব্যবহারের জন্য উৎকৃষ্ট মসলিন ও জামদানি সংগ্রহের জন্য ঢাকায় তাদের গোমস্তা নিযুক্ত ছিল। ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ আরম্ভ হয় মুঘল আমলে । এ সময় যে শুধু মসলিন ও জামদানি শিল্পের উন্নতি হয় তা নয়, দেশে-বিদেশে জামদানি ও মসলিনের চাহিদাও তখন থেকেই বাড়তে থাকে। আঠারো শতকের ইংরেজ কোম্পানির দলিলে দেখা যায় যে মলমলখাস (mulmul khas) ও সরকার-ই-আলি নামক মসলিন সংগ্রহ করার জন্য ঢাকায় একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন। তার উপাধি ছিল দারগা-ই-মলমল। প্রত্যেক তাঁতখানায় একটি করে দপ্তর ছিল এবং সেখানে আড়ং এর অত্যন্ত নিপুন তাঁতি, নারদিয়া, রিপুকার ইত্যাদি কারিগরের নাম তালিকাবদ্ধ করে রাখা হতো। তাঁতখানায় তাঁতিদের কোন নির্ধারিত বেতন ছিল না। তারা যতখানি মসলিন বা জামদানি তৈরি করত ঠিক তার বাজারমূল্য দেওয়া নিয়ম ছিল। দারগার প্রধান কাজ ছিল মসলিন বা জামদানি তৈরির প্রতি পদক্ষেপে তীক্ষ দৃষ্টি রাখা। এভাবে ঢাকা সোনারগাঁও, জঙ্গলবাড়ি ইত্যাদি থেকে প্রায় প্রতি বছর একলক্ষ টাকা মূল্যের মলমল-খাস মুঘল দরবারে পাঠানো হতো।


Share with :
Facebook Facebook